দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে মাত্র পাঁচটি প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা।
বর্তমানে লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সিভিল, ইলেকট্রনিক্স, আর্কিটেকচার ও ইলেকট্রিক্যাল—এই পাঁচটি প্রযুক্তিতে দুই শিফটে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হলেও তাদের জন্য নেই কোনো নিজস্ব ছাত্রাবাস। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে মেস বা ভাড়া বাসায় থেকে অতিরিক্ত আবাসন, খাবার ও যাতায়াত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
ভয়াবহ শিক্ষক সংকট প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক সংকটও প্রকট। অধ্যক্ষসহ ইন্সট্রাক্টর পর্যায়ে মোট ১০৮টি পদের মধ্যে ৭০টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদের ১২টি এবং ৪৯টি ইন্সট্রাক্টর পদের ৪০টি পদ খালি। এছাড়া ৪৫টি জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদের মধ্যে ১৮টি পদও শূন্য রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তিই যেখানে ব্যবহারিক শিক্ষা, সেখানে শিক্ষক ও জনবল সংকট শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাহিদার সঙ্গে মিলছে না প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়ের সঙ্গে দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের ধরন বদলে গেলেও লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিকের প্রযুক্তি শিক্ষায় সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন যথেষ্ট নয়। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ, অটোমেশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে।
এ কারণে মেকানিক্যাল, পাওয়ার, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং (RAC), মেকাট্রনিক্স/অটোমেশন এবং ফুড টেকনোলজির মতো চাহিদাভিত্তিক প্রযুক্তি চালুর দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অটোমোবাইল, কেমিক্যাল ও টেক্সটাইল প্রযুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র শাহিন আহমেদ বলেন, “প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বাড়াতে দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান চাকরির বাজারের চাহিদা বিবেচনায় আরও ৬-৭টি প্রযুক্তি চালু করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের পাশে ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি ছাত্রাবাস নির্মাণেরও দাবি জানাচ্ছি।”
দরকার অতিরিক্ত ১০ একর জমি নতুন প্রযুক্তি চালুর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত জমি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের পাশে অন্তত ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা গেলে সেখানে নতুন একাডেমিক ভবন, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ওয়ার্কশপ, ছাত্রাবাস, খেলার মাঠ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণ করা সম্ভব হবে। একজন শিক্ষক বলেন, “প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের পাশের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে আধুনিক খেলার মাঠ ও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ডরমিটরি নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।”
ছাত্রাবাস না থাকায় বাড়ছে ব্যয় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা লক্ষ্মীপুরে পড়তে এলেও তাদের জন্য আবাসিক সুবিধা নেই। ফলে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এ ব্যয় অনেক সময় পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হলে একদিকে যেমন আবাসন সংকট কমবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশও উন্নত হবে।
সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার দাবি লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রথম ধাপে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ, এরপর একাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরি ও ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং পর্যায়ক্রমে নতুন প্রযুক্তি চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পৃথক দুটি ছাত্রাবাস, শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসন ও আধুনিক খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ প্রয়োজন।
লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ দেবব্রত কুমার নাথ বলেন, “যুগের সঙ্গে এবং বর্তমান ছাত্র-শিক্ষকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৬-৭টি প্রযুক্তি বৃদ্ধি করা গেলে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হবে।” সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি চালু এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শুধু জেলার নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
কেএম